সোমবার, ৭ এপ্রিল, ২০১৪

কাইয়ে ধান খাইলরে

হুমায়ন আহম্মেদের নাটকে একটি ডায়ালগ ছিলো- "কুকুরকে কুত্তা বলিবেন না, মাইন্ড করবে"।
ডায়ালগটি খুব জনপ্রিয় হয়েছিলো। মুখে মুখে প্রচারের পাশাপাশি বেড়িয়েছিলো এর স্টিকারও...

আমি ভাবছিলাম- পশুপ্রেমী এ ডায়ালগের পাশাপাশি পাখিপ্রেমী ডায়ালগ হতে পারতো- "কাককে কাউয়া বলবেন না, মাইন্ড করবে"।
যদিও আমি জানিনা, কুকুরকে কুত্তা আর কাককে কাউয়া বলিলে তারা আদৌ মাইন্ড করে কিনা? কিংবা মাইন্ড করার মতো মাইন্ড তাদের আছে কিনা? কিংবা কুকুরকে কুত্তা না বলিয়া কুকুর আর কাককে কাউয়া না বলিয়া কাক বলিলে তারা খুশি হয় কিনা?
তবে এটা জানি, কুকুর আর কাক রূপিদের আপনি কুকুরই বলুন কিংবা কুত্তা, কাকই বলুন কিংবা কাউয়া, তারা মাইন্ড করবে।

আপনি পশু-পাখি প্রেমী হতেই পারেন। তবে পশু-পাখি রূপিদের প্রেমী হবেন কিনা সেটাই গুরুত্বপূর্ন। পশুর কামড় আর পাখির ঠোঁকড় এড়াতে চুপ থাকবেন কিনা সেটাও বিবেচ্য।
মোসাহেবরা হয়তো কাককে কোকিল বলছে! কুকুরকে বলছে বাঘ!
আপনি নিরব! মনে মনে কুকুরকে যতই শুকুর বলুন, মনে মনে শুধু মনকলাই খাওয়া হবে, পেট ভরবে না!
তবে পেট না ভরলেও, মনকলা খাওয়ার মনস্তাত্বিক এক মজা আছে নিশ্চই! আর তাইতো কিছুদিন আগে গনতন্ত্রকে নসাৎ হতে দেখা জাতি, নিজ দেশে গনতন্ত্রের প্রশ্নে নিরব থাকলেও, বৃহৎ প্রতিবেশীর বৃহৎ গনতন্ত্র উৎসবে ব্যপক আগ্রহ দেখাচ্ছে!

আমি ভাবছিলাম- জারি-সারি গানের বাংলাদেশে, সারি গান কতটা প্রাসংগিক, কতটা বাস্তবমূখি?
"ও কাইয়ে ধান খাইলরে
খেদানোর মানুষ নাই
খাওয়ার বেলায় আছে মানুষ
কামের বেলায় নাই
কাইয়ে ধান খাইলরে

ওরে ও পাড়াতে পাটা নাই পুতা নাই
মরিচ বাটে গালে
ওরা খাইলো তাড়াতাড়ি
আমরা মরি ঝালে
কাইয়ে ধান খইলরে.."

সত্যি, গত নির্বাচনে আওয়ামী কাউয়া দেশের গনতন্ত্র ধান খেয়ে ফেলেছে। যখন গনতন্ত্রের জন্য কাউয়া খেদানো দরকার, তখন গনতন্ত্রের উৎসবের আবির বৃহৎ প্রতিবেশীর গালে, আর তাতেই আমরা মরছি গনতন্ত্র প্রেমের ঝালে!

প্রিয় কান্ট্রিমেট, প্লিজ ওয়েক আপ.....
খোকা ঘুমালে পাড়া জুড়াবে ঠিকই, কিন্তু খোকার বাপে ঘুমালে দেশটা বর্গিদের দখলে চলে যাবে! তখন কাউয়ায় ধান খেয়েছে বলে খাজনার টাকা দিতে অপেক্ষা করতে হবে পরবর্তি রসুনের ওপর...

দেশের জন্য তা হবে এক অনন্ত আক্ষেপ!!

মঙ্গলবার, ১৮ মার্চ, ২০১৪

গেহস্ত্যর দশদিন

এ দেশে একটা প্রবাদ আছে- "চোরের দশ দিন আর গেহস্থ্যর এক দিন"।
শেষ পর্যন্ত সত্য ও সততার বিজয়কে ইংগিত করেই এটা বলা হয়ে থাকে।
কিন্তু সমস্যা হলো- বিজয়ই যেখানে শেষ কথা, গেহস্থ্য সেখানে চোরের কাছে ১০-১ এ পরাজিত! ব্যবধান ৯!
আর করুন পরিহাস হলো- বিজয়ীর শিন্ন চোষা আমাদের চেতনা, গেহস্থ্যর বিজয় কামনা করে বিজয়ী চোরের শিন্ন চুষতে চুষতে!
৫ জানুয়ারী এ দেশে যে নির্বাচনটি হয়েছে- সেটা দেশের জন্য এক সমস্যা, গনতন্ত্রের জন্য পরিহাস।
এ দেশের আপামর ভোটার বা গেহস্থ্যর দ্বারা প্রত্যাক্ষাত এ নির্বাচনে বিজয় হয়েছে কাদের?
গনতন্ত্রকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো চোরদের! জোর যার মুল্লুক তার, মুলুকের ডাকুদের!

অনেকেই এখন বলতে পারেন- ৫ জানুয়ারীর বিজয়ীরা একটি নির্বাচিত সরকার! যারা কিনা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সাংবিধানিক ধারা রক্ষা করেছে!
এ কথার জবাব দেওয়ার আগে আমি তাদেরকেই প্রশ্ন করতে চাই- ৫ জানুয়ারী কি আপনি ভোট দিয়েছিলেন? এ দেশের আপামর জনগন কি ভোট দিয়েছিলো? অর্ধেকেরও বেশী ১৫৩ আসনের ১ জন ভোটারেরও ভোটাধিকার ছিলো?
না। আপনি ভোট দেন নি! এ দেশের আপামর জনগন ভোট দেয়নি! ১৫৩ আসনের ভোটারেরা ভোট দিতেই পারেনি! তাহলে এ সরকারকে নির্বাচিত সরকার বলেন কিভাবে?

অনেকে বলতে পারেন- ৫ জানুয়ারী আমি ভোট দিয়েছি, আমার এফ.এন.এফ.(ফ্রেন্ডস এন্ড ফ্যামিলি) ভোট দিয়েছে। সর্বোপরি নির্বাচন হওয়া এলাকার প্রায় ৩৮ শতাংশ মানুষ ভোট দিয়েছে। তাই এ সরকার জননির্বাচিত সরকার।
উত্তরঃ কথাটি শুনতে হয়তো খারাপ লাগবে, কিন্তু বাস্তবতা এটাই যে- ৫ জানুয়ারী নির্বাচনে যদি আপনি ভোট দিয়ে থাকেন, তবে তা এ দেশের জনগন হিসাবে দেননি, একজন আওয়ামীলীগার হিসাবে দিয়েছেন! বা আওয়ামী আর্মি হিসাবে একটি একতরফা ও অগ্রহনযোগ্য নির্বাচনকে বৈধ করার বা নুন্যতম পাতে তোলার প্রচেষ্টায় শামিল হয়েছেন!
আপনি ৩৮ শতাংশ ভোটের কথা বলছেন?
সারাদিন কেন্দ্র দখল, জাল ভোটের মহোৎসব বাদই দিলাম, বিভিন্ন টিভি ক্যামেরায় ভোট কেন্দ্র ভোটার শূন্য থাকলেও ফলাফলে, যাদুকরের রুমালে ঢাকা শূন্য টুপির ভেতর থেকে 'এ্যবরা কা ড্যাবরা' ছুমন্তরে খরগোস বেরিয়েছে!
এখন চক্ষুসাফাইয়ে যাদুকর শূন্য থেকে খরগোস বের করায় সর্বোচ্চ হাত তালি পেতে পারে, সৃষ্টিকারী স্রষ্টার স্বীকৃতি পেতে পারে না।

আর সাংবিধানীক ধারা অক্ষুন্ন রাখা?
হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান আন্ডারসনের রুপকথা ""The Emperor's New Clothes"-এ রাজা যে নতুন পোষাক পড়েছিলো, তা শুধু সৎ মানুষেরাই দেখতে পারবে! তাই অসৎ উজির-নাজিরেরা মেকি সততার চশমা পড়ে উলঙ্গ রাজার পোশাকের প্রশংসায় মেতে ছিলো! জনগনও রাজার ভয়ে ও অসততা প্রকাশের ভয়ে চুপ ছিলো! তারা সবাই দেখেছিলো- 'রাজা নেংটা'। কিন্তু তাদের দৃষ্টিকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিলো তাদের অসততা।
রুপকথা পেরিয়ে বাংলাদেশের বাস্তবকথায়, এ দেশের মরাল ব্রিগেড আমাদের পরিয়ে দিয়েছে চেতনার চশমা। আর তাই আমারা সবাই দেখছি- ৫ জানুয়ারী আওয়ামীলীগ উলঙ্গ হয়ে গেছে! কিন্তু আমাদের চোখকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে সাংবিধানিক ধারা, দলগত পক্ষপাত এবং ব্যক্তিগত অসততা।

অনেকেই এখন বলতে পারেন- বৃহৎ দল বিএনপি এ নির্বাচনকে মেনে নিয়েছে বলেই মনে হচ্ছে! মুখোমুখি অবস্থানকারী ও সংঘাত সৃষ্টিকারী রাজনীতিও বেশ স্থীতিশীল। দেশেও শান্তি বিরাজ করছে। জাতীয় পতাকা বানানোর ও জাতীয় সংগীত গাওয়ার বিশ্বরেকর্ড হচ্ছে। টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ হচ্ছে। হয়েছে প্রায় তিন শতাধিক ভারতীয় শিল্পির নাচে-গানে তার সেলিব্রেশনও! দেশ ভালোই চলছে। তাহলে সমস্যা কোথায়?
উত্তরঃ আসলে সমস্যা যে কোথায়? এটা জানতে হলে প্রশ্নটি করতে হবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'দুই বিঘা জমির' উপেনকে!
শাক পাতা আচঁলে ধরা দরিদ্রমাতা যখন লুটেরার আদরে, পাঁচ রঙ্গাপাতা অঙ্গে আর পুষ্প কেশে ধারন করে! এটা গৌরব নয় বরং লজ্জার। এ লজ্জা দেবীর দাসী পরিনতির। সমস্যাটা এখানেই।
আর বিএনপির নির্বাচন মেনে নেওয়া?
এদেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ট মানুষ ৫ জানুয়ারী নির্বাচনকে প্রত্যাক্ষান করে ভোট দেয়নি। এর মানে এই নয় যে, বিএনপির সমর্থন ব্যাঙ্কে এটি ফিকস্ট ডিপোজিট হয়ে গেছে!
আমাদের বুঝতে হবে- রাজনৈতিক দলের কন্ঠ কখনো গনমানুষের কন্ঠ হতে পারে না। বরং গনমানুষের কন্ঠ রাজনৈতিক দল ধারন করে। তাই বিএনপি যদি নির্বাচনকে মেনেও নেয়, এটা জনগনের কন্ঠ হতে পারে না। এটা, জনগনের ভোটাধিকারের কন্ঠ ধারন করতে রাজনৈতিক দল হিসাবে বিএনপির ব্যর্থতা।
রাজনৈতিক দলের এ ব্যর্থতার সময়ে নিজেদের অধিকারের প্রশ্নে জনগনের কন্ঠকে জনগনের মধ্য থেকেই বেশী করে উচ্চারিত হতে হবে। যেখানে গেহস্থ্যর বিজয় প্রত্যাশা থাকবে তবে চোরের বিজয়কে মেনে নিয়ে নয়! চোরকে চোরই বলতে হবে। উলঙ্গ রাজাকে নেংটাই বলতে হবে। তাহলে চোরের দশ দিনের বিপরীতে গেহস্থ্যের একদিন নয় বরং চোরের একদিনের বিপরীতে গেহস্থ্যর দশদিন হয়ে উঠবে।

তবে, চোরের দশদিন আর গেহস্থ্যর একদিনই হোক কিংবা চোরের একদিনের বিপরীতে গেহস্থ্যর দশদিন(মোট এগারদিন)। আমি ভাবছিলাম- দিনের সংখ্যা বিচারে তুলনাটি যথার্থ হয়নি! এগারো সংখ্যাটি মৌলিক, তবে দিনের সংখ্যা প্যাটার্ন নয়। প্যাটার্ন অনুযায়ী দিনের সংখ্যা ৭, ১৫ কিংবা ৩০। যেমন ৭ দিনে এক সপ্তাহ, ১৫ দিনে একপক্ষ, ৩০ দিনে একমাস। লক্ষ্যনীয়, সংখ্যা হিসাবে ১১ দিনের প্যাটার্ন নয়। তাই এ প্রবাদটি হওয়া উচিত ছিলো, মৌলিক ও সংখ্যা প্যাটার্ন ৭ কে ধরে- "চোরের ছয়দিন আর গেহস্থ্যর একদিন"।

এখন পাঠক হিসাবে আপনাকে প্রশ্ন- 'চোরের ছয়দিন আর গেহস্থ্যর একদিন' হয়তো তুলনা হিসাবে যথার্থ কিন্তু এ নব্য প্রবাদের যথার্থ উদাহরন কোনটি?
আপনি যদি এ প্রশ্নের উত্তর দিতে স্বামর্থ্য হন, তবে আপনাকে অভিনন্দন। আর যদি অস্বামর্থ্য হন, তবে উত্তর পেতে আপনাকে যেতে হবে পৃষ্ঠা ৩ এ! এবং পড়তে হবে "সাত বছরের চুলকানি"।

 

সাত বছরের চুলকানি

সংখ্যা হিসাবে ৭ মৌলিক। দিনের হিসাবে ৭ সপ্তাহের সংখ্যা প্যাটার্ন। নাম্বার হিসাবে ৭ লাকি। এ ছাড়াও ৭ কে নিয়ে রয়েছে নানা মাহত্ব! ৭ সমুদ্র, ৭ আসমান, ৭ মহাদেশ, ৭ নিয়েই সপ্তাচার্য, এবং বছর হিসাবে ৭ চুলকানির!
সাধারনত, দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে খুটখাট লাগতে পারে, যা কিনা বিবাহ বিচ্ছেদেও গড়াতে পারে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে- বিবাহিত জীবনের ৭ বছরেই বিবাহ বিচ্ছেদ বেশী হয়! যেটাকে বলা হয় স্বামী-স্ত্রীর ৭ বছরের চুলকানী। তারা যদি এটা অতিক্রম করতে পারে তবে তাদের সম্পর্কটা টিকে যায়! টিকে যায় বলেই, পরিসংখ্যান মতে- ৭ বছরের পর পরিসংখ্যান মতে বিবাহ বিচ্ছেদ খুব কম হয়।

স্বামী-স্ত্রীর এই সাত বছরের মিথ নিয়েই হলিউডে নির্মিত হয়েছিলো, রোমান্টিক কমেডি মুভি "The Seven Year Itch"(1955) বা 'সাত বছরের চুলকানী'। যেখানে মেরিলিন মনরো অনবদ্য অভিনয় করেছিলেন। এ মুভি করতে গিয়েই হঠাৎ বাতাসে উড়ন্ত কাপড়কে রক্ষা করতে চাওয়ার সাথে মোহনীয় হাসির পোজ দিয়ে ছবি তুলেছিলেন মনরো। যে ছবি দেখে মনরোর প্রেমে পড়েছিলেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট কেনেডি এবং প্রেমে পড়েছিলাম আমি নিজেও!
অর্থ্যাৎ, চুলকানীতে শুধু ৭ বছরে স্বামী-স্ত্রীই আক্রান্ত হয় না। জীবনের যে কোন পর্যায়ে চুলকানীতে আক্রান্ত হতে পারে একটি দেশের প্রেসিডেন্ট, এমনকি আমার মতো সাধারন মানুষও! এ চুলাকানীতে যেমন আক্রান্ত হতে পারে একটি দাম্পত্য সম্পর্ক, তেমনি আক্রান্ত হতে পারে একটি পত্রিকাও!
বিশেষত, যখন সপ্তাহের পত্রিকা 'সময় অসময়' ৬ বছর পেরিয়ে ৭ বছরে পা দিচ্ছে, তখন ৭ বছরের চুলকানীর মিথকে স্বরন করা অমূলক হবে না নিশ্চই। আমি আশা করছি, এ ঝুকিপূর্ন ৭ম বছরে 'সময় অসময়' যে কোন রকম চুলকানীমুক্ত বস্তুনিষ্ঠ থাকবে। অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন- জীবনের যে কোন পর্যায়ে যদি চুলকানীতে আক্রান্ত হয়, তবে ৭ বছরের পরে কেন হয় না? বা ৭ বছরের পরে কেন বিবাহ বিচ্ছেদ খুব কম হয়?
উত্তরঃ সম্ভবত, ৭ বছরের পর আলাদা পরিপক্কতা তৈরী হয়। যখন চুলকানীকে প্রাধান্য দেবার সময় থাকে না। ফলে সম্পর্ক্যটি আজীবনের জন্য টিকে যায়।
আমি আশা করছি, এ ৭ম বছরে 'সময় অসময়' আলাদা পরিপক্কতা অর্জন করবে। এবং আজীবনের জন্য টিকে যাবে।
'সময় অসময়'কে টিকে থাকতেই হবে। যে পত্রিকাটা সপ্তাহের ৬ দিনের অন্যায়-অবিচারকে ১ দিনে তুলে ধরছে। শেষ পর্যন্ত সত্য ও সততার বিজয়ের এটাইতো অসাধারন রুপক! "অন্যায়কারীদের ছয়দিন আর 'সময় অসময়ের' একদিন"।
তবে টিকে থাকার লড়াইয়ে 'সময় অসময়'কে অবশ্যই ৭ বছরের চুলকানী পেরিয়ে যেতে হবে।

মঙ্গলবার, ২১ জানুয়ারি, ২০১৪

শতেক দূরে ফোটা করবী

গনতন্ত্র যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে...
এপাশ হলেও ব্যাথা, ওপাশ হলে অসহ্য যন্ত্রনা। সৈরাতন্ত্রের হাঁড় মড়মড়ে রোগে ধরেছে গনতন্ত্রকে!
কত ওঝা এলো, কত হেকিম গেলো, কিছুতেই কিছু হয় না! পাট কাঠি ভাঙ্গার শব্দে ভাঙ্গে হাঁড়। সে শব্দ বিলীন হয় যন্ত্রনার আর্তনাদে...
ভাঙ্গা হাড়ে, ভাঙ্গা স্বরে- শেফা চায় গনতন্ত্র। বিনিময়ে ফিরিয়ে দেবেন ভোটের অধিকার। আর বাকস্বাধীনতা হরন হবে না, বিরোধীর বুকে চলবেনা গুলি..গনতন্ত্র শুধু শেফা চায়। যন্ত্রনা থেকে মুক্তি চায়...
রাজ হেকিম নাড়ি টিপে কোন আশা পান না! প্রচারমন্ত্রী অবশ্য ঢোল পিটিয়ে চোঙ্গায় মুখদিয়ে ঘোষনা করেন- গনতন্ত্র ভালো আছে, সুস্থ্য আছে, গনতন্ত্রের মানসকন্যার হাতে দিব্যি হাসছে, খেলছে...
প্রচার যন্ত্রের এমন সুপ্রচারে ফিরে যায় আসস্ত পূজারী জনগন। গনতন্ত্র চিৎকার করে ডেকে ফেরে- ফিরে আসো নূর হোসেন, ফিরে আসো মিলন...
কিন্তু হাঁড় মড়মড়র শব্দে হারিয়ে যায় এ আহবান! এখন গনতন্ত্রের কথা শোনার কেউ নেই, গনতন্ত্রের কথা বলার কেউ নেই...

অবশেষে গনতন্ত্রের ডাকে একজন সাড়া দিলেন, এক দেবদূত এলেন হেকিম সেজে! নিস্তেজ গনতন্ত্র যখন মৃত্যুর প্রহর গুনছে....
দেবদূতে স্পর্শে ক্ষনিক স্বস্তি পায় গনতন্ত্র। বাঁচার তীব্র আকুতিতে জানতে চায় তার সুস্হ্যতার দাওয়াই।
দেবদূতের মনে তখন অন্যকিছু! মুচকি হেসে সে জানায়- দাওয়াই একটা আছে, তবে সে বড় কঠিন দাওয়াই!
মুমূর্ষ গনতন্ত্রের চোখ চকচক করে ওঠে- কি? পৃথিবী তন্নতন্ন করে ১০৮ টি নীলপদ্ম আনতে হবে?
দেবদূতঃ না, সে আরো কঠিন দাওয়াই।
বাঁচার আকুতিতে গনতন্ত্র আরো দৃঢ় হয়ে ওঠে- তবে কয়েক তাল মাটির নিচ থেকে খুঁজে আনতে হবে আমার প্রান ভ্রমরা?
দেবদূতঃ না, সে আরো কঠিন চিজ।
অধৈর্য হয়ে ওঠে গনতন্ত্র- তবে কি সে দাওয়াই?
দেবদূতঃ বর্তমান সংসদের সরকার বিরোধী সমালোচনা! অন্তত একজনের মুখে সমালোচনা শুনতে হবে। শুনলেই তুমি সুস্থ্য হয়ে যাবে..
একথা শুনে হেসে ওঠে গনতন্ত্র, ভুলে যায় হাঁড় ভাঙ্গা যন্ত্রনা, অট্ট হাসিতে চারপাশ কাঁপিয়ে বলে- এ আর এমনকি? শেয়ার বাজারের লুটেরাদের, শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাসকারীদের, নির্বাচনকে খেলো করে ভোটারদের দ্বারা প্রত্যাক্ষাতদের সমালোচনা? এখনি শুনে নিচ্ছি, এখনি সুস্থ্য হয়ে উঠছি...
দেবদূত মুচকি হেসে বলে- ধীরে বৎস, ধীরে। এতটা সহজ নয়! দেখ চেষ্টা করে পারো কিনা! এখন আমার যাবার সময় হয়েছে, কাল এসময় আবার আসবো..
'কাল এসে আমাকে সুস্থ্যই দেখবেন' বলে দেবদূতকে বিদায় জানায় গনতন্ত্র। দেবদূত বিদায় নেয় মুচকি হেসে...

অনেকদিন পর, সুস্থ্যতার সম্ভবনায় উঠে দাঁড়ায় গনতন্ত্র। তার এখন অনেক কাজ, সংগ্রহ করতে হবে সুস্থ্যতার দাওয়াই! বর্তমান সংসদের সরকার বিরোধী অন্তত একটি সমালোচনা!
যদিও এবার নির্বাচন হয়েছে একতরফা, তবুও সরকারের বাহিরের সাংসদ তো আছে, আছে বিরোধীদলও। সমালোচনার দাওয়াই খুব সহজেই পাওয়া যাবে..
গনতন্ত্র চোখ বুলিয়ে নিলো, দশম সংসদের দলভিত্তিক আসন সংখ্যায়-আওয়ামী লীগ ২৩৩, জাপা ৩৪, স্বতন্ত্র ১৫, ওয়ার্কার্স পার্টি ৬, জাসদ (ইনু) ৫, তরীকত ফেডারেশন ২, জেপি ১ ও বিএনএফ ১টি আসন।
এর মধ্যে সমালোচনা লিস্ট থেকে আওয়ামীলীগের ২৩৩ জন বাদ, তাদের কাছে তাদের সমালোচনা আশা করাও দুরাশা! গনতন্ত্রকে যেতে হবে অবশিষ্ট ৬৬ জনের কাছে। যেতে হবে- সংসদীয় গনতন্ত্রের সৌন্দর্য খুঁজতে, গনতন্ত্রের সৌন্দর্য্য আর সুস্থ্যতা যে সেখানেই...

প্রধান বিরোধীদল জাতীয় পার্টির কাছে প্রথম ধাক্কা খায় গনতন্ত্র! সরকারের সমালোচনা করবে কি? তারা তো এখন সরকারের অনুগ্রহে প্রধান বিরোধীদল হবার গরবে গরবিনী। একই সাথে বিয়ের ছেলে আর মেয়ের বাপ হবার হিস্যায়, একই সাথে প্রধান বিরোধীদল আর মন্ত্রীসভার ভাঁড় হতে তারা ব্যস্ত, তারা ব্যস্ত নিজেদের মন্ত্রী বানানোর আর মন্ত্রী বাড়ানোর দরকষাকষিতে। দেশ গোল্লায় যাক, মন্ত্রীর সংখ্যা বাড়লেই হলো! এখানে টান পড়লেই তারা সমালোচনা করবে, সে সময় এখনো ঢের বাকি! চার মন্ত্রীর আম আর এক বিশেষ দূত তারা পেয়েছে, এমন আম-দুধ সময়, সমালোচনায় কেইবা নষ্ট করবে?

তারপর গনতন্ত্রকে একে একে ধাক্কা খাবার পালা! ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ (ইনু) সবাই এখন একই লাওয়ের মাঝি! কোথায় আজ সিরাজ শিকদার? সত্যি, আজ কোথাও নেই....!!
তরীকত ফেডারেশন, জেপি, বিএনএফ এমনকি সতন্ত্র ১৫ জন, তারা সমালোচনা করবে কি? তারা অনুগ্রহ আর অনুকূলের কৃতজ্ঞতায় ব্যস্ত! অবিশ্বাসী হয়ে তারা সরকারের কোন অবদানকে অস্বীকার করবে?
হঠাৎ গনতন্ত্রের যন্ত্রনা বেড়ে যায়। হাড়গুলো মড়মড় করে ওঠে। দীর্ঘ সংগ্রামে অর্জিত গনতন্ত্র, মাটিতে লুটিয়ে পড়ে! লুটিয়ে পড়ে বাংলাদেশও....

পরের দিন দেবদূত যখন এলেন, গনতন্ত্র তখন নিস্তর-নিথর। হাঁড় মড়মড়ে আওয়াজ নেই, নেই জীবনের চিন্হও.....
ইতিমধ্যেই কবর খোঁড়া হয়েছে, এপিটাফও লেখা হয়েছে! কিন্তু বাধ সাধে এক ছায়ামূর্তি....গনতন্ত্রকে সে কবর দিতে দেবে না!!!
দেবদূতঃ কে তুমি?
ছায়ামূর্তিঃ আমি নূর হোসেন।
দেবদূতঃ কোন নূর হোসেন?
ছায়ামূর্তিঃ আমি স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে জীবন দেয়া 'নূর হোসেন'। আমি সেই নূর হোসেন, যে গনতন্ত্রকে সেসময় করব দিতে দেয় নি।
দেবদূতঃ ভুল করেছ, রক্তের বৃথাই অপচয় করেছ। যেখানে অধর্মের আবাদ হয়, ধর্ম সেখানে আগাছা! গনতন্ত্র এখন সেচ্ছাচারিতার আবাদে আগাছা হয়ে গেছে এবং সেটা উপড়ে ফেলা হয়েছে! সেচ্ছাচারিতায় উপরে ফেলা এ আগাছাকে কবর দিতে দাও। জীবনের ওপারেই মিলিত হও, তোমার কাংক্ষিত গনতন্ত্রের সাথে...
ছায়ামূর্তিঃ মিলবো বলে তো জীবন দেইনি? বরং এ দেশের ভবিষৎ'তের সাথে গনতন্ত্রকে মেলাবো বলে জীবন দিয়েছি।
আর গনতন্ত্র মৃত নয় যে একে কবর দিতে হবে! গনতন্ত্র মরনহীন..
দেবদূতঃ হাসালে তুমি মৃতআত্বা! জীবনের আইন সম্পর্কে তোমার চিন্তা শিশু সূলভ। তুমি কি বলছো- এ প্রানহীন গনতন্ত্র মৃত নয়?
ছায়ামূর্তিঃ হ্যাঁ, বলছি। এটা গনতন্ত্রের মৃত্যু নয় বরং অভিমান! গনতন্ত্র শুধু আইন নয় যে বেআইনে এর মৃত্যু ঘটবে! গনতন্ত্র একি সাথে, আইন এবং অনুভূতি। শুধু আইন ও অঘোষিত বেআইনে এর মৃত্যু ঘটবে না! যতক্ষন সাধারন মানুষের মনে গনতন্ত্রের অনুভূতি থাকবে, ততক্ষন গনতন্ত্রও থাকবে। যখন মানুষ চাইবে, যখন ডাকবে, গনতন্ত্র তখনই জেগে উঠবে...
দেবদূতঃ নূর হোসেন, তুমি এখন মৃত! নূর হোসেনেরাও এখন মৃত। মানুষ আর গনতন্ত্রকে চায় না! গনতন্ত্রকে আর ডাকে না। সরে যাও গনতন্ত্রকে এখন কবর দিতে দাও, আমাকে আমার কাজ করতে দাও..
ছায়ামূর্তিঃ তার আগে আমার একটি প্রশ্নের উত্তর দাও- কোনটি বেশী পবিত্র? তোমার এই কাজ নাকি গনতন্ত্রের জন্য দেয়া আমার বুকের রক্ত?
দেবদূতঃ অবশ্যই শহীদের রক্ত। সেটা সব কিছুর চেয়ে পবিত্র...
ছায়ামূর্তিঃ শহীদের রক্তই যদি শ্রেষ্ট হয়, তবে যার জন্য এ শাহাদত সেটা কি শ্রেষ্ট নয়? এ আদর্শের কি কবর হতে পারে?
বিব্রত দেবদূত থমকে যায়! চাপা স্বরে বলে- তাহলে কি চাও তুমি?
ছায়ামূর্তিঃ অভিমানী গনতন্ত্রকে কবর নয় বরং করবী ফুল করে দাও, আমার রক্তে রাঙ্গা হয়ে সেটা ফুটে থাক রক্ত করবী হয়ে! যেমন রুপকথার সাতভাই ফুটেছিলো সাতটি চম্পা ফুল হয়ে।
সেদিন আর বেশী দূরে নয়, যেদিন একটি পারুল বোনের সাথে যখন সবাই ডাকবে, তখন সাতভাইয়ের মতো গনতন্ত্রও জাগবে।
যখন, বাংলা মায়ের ব্যথায় গাছের পাতা ঝরে
কাঁদবে বনের পাখি কুহু কুহু স্বরে।
একটি পারুল বোন থাকবেনা একা ঘরে
করবী মিলবে রাজপথে, রক্তের অক্ষরে
সেদিন রাষ্ট্রযন্ত্রের বন্দুক ফুড়ে
গনতন্ত্রের জীবন পাবার দিন আসবে ফিরে।।
সুরের মায়া কাটিয়ে মুগ্ধ দেবদূত বললেন- তথাস্তু।

গনতন্ত্র এখন ফুটে থাকা রক্ত করবী ফুল। সৈরাতন্ত্রে পূজা দেবেনা বলে উঠেছে শতেক দূর! ভালোবেসে এখন গনতন্ত্রকে ডাকতে হবে, যে ভালোবসায় নূর হোসেন পথে নেমেছিলো, যে ভালোবাসায় বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছিলো