রবিবার, ২৪ এপ্রিল, ২০১১

স্রষ্টা সবার জন্য নয়!!!

সকালে পত্রিকা কিনে সবে মাত্র চা'র দোকানে বসেছি। কালো রং, উসকো খুসকো চুল, বিশেষত্বহীন টোকাই চেহারার একটি ছেলে, কতই আর বয়স? নয়-দশ। এক হাতে রুটি অন্য হাতটা আমার দিকে বাড়িয়ে করুন চেহারায় বললো- পাঁচটা ট্যাকা দেন।
বিরক্তি নিয়ে বললাম-টাকা দিয়ে কি করবি?
চা দিয়া রুটি খামু, ছেলেটির তাৎক্ষনিক জবাব।
করুনা প্রত্যাশি একটি ছেলের স্পষ্ট জবাবে বিরক্ত আমি ততোক্ষনে পত্রিকায় মনোযোগ দিয়েছি। কিছুক্ষন পর খেয়াল করে দেখি, ছেলেটি তখনো দাড়িয়ে, আনমনে রুটির ফোলা অংশ ছিড়ে খাচ্ছে।
আমি দোকানদারকে ছেলেটির জন্য চা দিতে বলে পত্রিকায় চোখ বোলাচ্ছি, প্রথম আলো'র সারা বিশ্ব পাতায় পড়ছিলাম "পাঁচ বছরের তারকা সুরি"। স্বনামখ্যাত হলিউড তারকা টম ক্রুজ ও কেটি হোমসের মেয়ে সুরি। গায়ের উজ্জল রং, ভিন্ন ধাঁচের বাদামি চুল, সবুজ চোখ ও মিষ্টি চেহারায় অন্য রকম বিশেষত্ব এনে দেয়া সুরি, নিজ মহিমাতেই শিশু তারকা। যার প্রত্যেকটি পোষাকের দাম দুই হাজার ডলার, যার ওয়ারড্রোবেই আছে ২৫ লাখ ডলারের পোশাক!
মনটা হঠাৎ খাখা করে ওঠে.....চোখ তুলে তাকাই- টোকাই ছেলেটি তখন চায়ে রুটি ভিজিয়ে খেতে ব্যস্ত।
আমি বলি- স্কুলে যাস?
কোন জবাব আসে না!
হয়তো শুনতো শুনতে পায়নি, হয়তো শুনলেও জবাব দেবার প্রয়োজন বোধ করে নি! টোকইয়ের আবার স্কুল!!!
আমি ভাবছিলাম. স্রষ্টা সতিৎ দয়াময়! তার দয়ায় এই ছেলেটির স্কুল ভাগ্য নেই!
এই ছেলেটি যদি স্কুলে যেতো, তাহলে হয়তো হিসেব কষে বের করে ফেলতো, ২৫ লাখ ডলার সমান কত টাকা! ছেলেটি তখন বুঝে যেতো স্রষ্টা সবার জন্য নয়! স্রষ্টা  থাকেন কোনো ভদ্র পল্লিতে, সুরিদের ওয়ারড্রোবে, টোকাইয়ের চায়ের কাপে নয়!
আমার চোখ ছলছল করে ওঠে.....আমি পত্রিকায় মুখ ঢাকি। লজ্জায়....না না ভয়ে! ছেলেটি যদি আমার চোখের ভাষা বুঝে ফেলে।

বুধবার, ২০ এপ্রিল, ২০১১

মূল্যবোধের বনসাই, ভগ্ন মহিলা কলেজ!!!

এই উপমহাদেশে "বৃদ্ধস্য তরুনি ভার্যা" বলে একটা কথা প্রচলিত আছে। সাধারনত বৃদ্ধরা তরুনী প্রেমিকা কিম্বা তরুনী স্ত্রীর সঙ্গ পছন্দ করেন। এই পছন্দ করাটা নৈতিক মূল্যবোধে চাপা পড়তে পারে আবার অনৈতিক বাসনার ভীমরতিতে পরিনত হতে পারে। আর যে ভীমরতিকে বলা যেতে পারে শুদ্ধ চিন্তার প্রহসন!
হয়তো মাইকেল মধুসূদন দত্ত এ ভীমরতি কাছ থেকে দেখেছিলেন, ব্যথিত হয়েছিলেন এবং ভগ্ন হৃদয় নিয়ে ১৮৬০ সালে লিখেছিলেন, সার্থক প্রহসন "ভগ্ন শিবমন্দির"। যদিও প্রকাশকালে তিনি নাম পরিবর্তন করে রাখেন- 'বুড়ো শালিখের ঘারে রোঁ'। সে বছরের প্রথমার্ধে তিনি লিখেছিলেন প্রহসন "একেই কি বলে সভ্যতা"?
প্রায় একই সময়ে লেখা তার এ দুটি প্রহসনে ছিলো বিপরীত চিত্র! 'একেই কি বলে সভ্যতা' প্রহসনটি ছিলো নব্য শিক্ষিত নাগরিক যুবকদের নিয়ে আর 'বুড়ো শালিখের ঘারে রোঁ' প্রহসনটি ঐ সমাজের বিপরিত পৃষ্ঠার অশিক্ষিত অথচ প্রভাবশালীর বাস্তব গল্প। যেখানে ধর্মে আস্হাশীল বৃদ্ধ ভক্ত, ভক্তি মালা হাতে নিয়ে দান দক্ষিনা দেয় না কিন্তু নারী দেহে লোলুপ হয়ে খাজনা মাফ করে দেয়। জাত-ধর্মের কথা বলে উপদেশ দেয়, আবার সেই কপট, নিষিদ্ধ আকাংক্ষায় মুসলিম নারির সান্নিধ্য কামনা করে।
এখন প্রশ্ন হলো, অশিক্ষিত বৃদ্ধ ভক্তের মতো অশিক্ষিতরাই কি বয়সের ভীমরতিতে আক্রান্ত হয় নাকি শিক্ষিত শালিখের ঘারেও রোঁ উঠতে পারে?
এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে আমি পড়ছিলাম, ১৮ এপ্রিলের সপ্তাহের পত্রিকা সময় অসময়ের একটি রিপোর্ট। "সর্ব মহলে সমালোচনার ঝড়, প্রভাষক বায়েজিদ বোস্তামি কর্তৃক ছাত্রীকে বিয়ে তালাক নাটক রচনা", শিরোনামে রিপোর্টিতে এসেছে- চাটমোহর মহিলা কলেজের ইংরেজির প্রভাষক বায়েজিদ বোস্তামি তার স্ত্রী, কলেজ পড়ুয়া মেয়ে ও স্কুল পড়ুয়া ছেলে ফেলে, মেয়ে বয়সী সাবেক এক ছাত্রীকে জানুয়ারী'১১তে গোপনে বিয়ে এবং এপ্রিলে পারিবারিক চাপে ডিভোর্স দিয়েছে!
আমি ভাবছিলাম, অনৈতিক বাসনার ভীমরতি শুধু অশিক্ষিত শালিখ নয় বরং প্রভাষক শালিখেরও ঘারে রোঁ তুলতে পারে! এবং এই রোঁ'টা যদি তিন মাসের ধরা ছাড়ার নাটক হয় তাহলে একে কোনোভাবেই 'বৃদ্ধস্য তরুনী ভার্যা' বলা যাবে না,  বরং একে বলতে হবে 'বৃদ্ধস্য তরুনী বিনোদন'!
 যদিও প্রভাষক বায়েজিদ বোস্তামির এই তরুনী বিনোদন সমাজের জন্য মুখরোচক সুখপাঠ্যেরও অযোগ্য......মূল্যবোধের কি চমৎকার পরাজয়! নীতি-নৈতিকতার আশ্চর্য প্রহসন! পিতৃসম শিক্ষক যেখানে প্রেমিক পুরুষ! মহান পেশায় নিয়োজিত স্বামী কিম্বা পিতা যেখানে প্রতারক! প্রতিকুলতা জয় করে বিয়ে অতঃপর তালাকদাতা সে তো কপট দুরাচারি!
কিন্তু এতোকিছুর পরও মি. বোস্তামির যে গুন ও দোষটা আমাকে বিশেষভাবে ভাবাচ্ছে- তিনি একজন বনসাই শিল্পি। কোন এক বৃক্ষমেলায় আমি তার বনসাই দেখেছিলাম এবং মুগ্ধ হয়েছিলাম। হয়তো তার এই বিশেষ গুনেই মুগ্ধ হয়েছিলো তার সেই ছাত্রীটিও! চাটমোহরের বাস্তবতায় এ শৌখিনতাটি এক অনন্য আভিজাত্য। সম্ভবত এ শৌখিনতাটি তাকে প্রভাবিত করেছে!!! এবং তিনি কোন নির্দিষ্ট গাছের পাশাপাশি বনসাইয়ের মতো ছোট  করে ফেলেছেন, তার চিন্তা-চেতনা-মূল্যবোধ। বনসাই করে ফেলেছেন, তার দায়বদ্ধতা-কৃতজ্ঞতা-দায়িক্তশীলতা। সংকির্ন করে ফেলেছেন শিক্ষা ও শিক্ষকতা।
তবে আমি শংকিত, হয়তো এ বনসাই প্রক্রিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে চাটমোহর মহিলা কলেজ! কিছুদিন আগেই শেষ হয়েছে মাধ্যমিক পরিক্ষা। আর কিছুদিন পর রেজাল্ট পরবর্তী উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তির জন্য, এমন ঘটনার পর শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকেরা স্বভাবতই মহিলা কলেজের বিষয়ে আগ্রহি হবে না তখন ভাবমূর্তি সংকটের পাশাপাশি কলেজ পড়বে ছাত্রী সংকটে!
তাই এই মুহূর্তে কোন বনসাই নয় বরং বিকাশিত করতে হবে চিন্তা ও মূল্যবোধ। কারন চাটমোহরের একমাত্র মহিলা বিদ্যাপিঠ(উচ্চ) কোন ভগ্ন কলেজে পরিনত হতে পারে না!-২০এপ্রিল'১১।

বৃহস্পতিবার, ১০ মার্চ, ২০১১

কাঙ্গালের হস্ত, করে সমস্ত কাঙ্গালের ধন চুরি!


বাংলায় একটা প্রবচন আছে, পেটের নাম মহাশয়, যাহা সহায় তাহাই সয়
আর তাইতো, সবজিতে বিষ, মাছে ফরমালিন, মুড়িতে ইউরিয়া, সবকিছুই অসহায়, হজম করে মহাশয়!
আমি জানিনা, ক্ষমতাশীনদের পেট নিয়ে এমন কোন প্রবাদ আছে কিনা? যে মহাশয়, আরো বড় বিষ্ময়! হজম করে ত্রানের টিন, রিলিফে ম্বল, দুম্বার মাংস এমন পেট নিয়ে কোন প্রবচন না থাকা সত্যি দূর্ভাগ্যজনকযা আমাকে করেছে বিষ্মিত ও বন্চিত। তবে এই মুহূর্তে আমি পড়ছিলাম চাটমোহরের কয়েকটি স্থানীয় পত্রিকা যেখানে ক্ষমতাশীন ম্যজিশিয়ানদের দুম্বার মাংস ভ্যানিশের রিপোর্ট এসেছে।
আমি ভাবছিলাম , নীতি নৈতিকতার দেউলিয়াত্বে দুই বিঘা জমির মত, দুই টুকরা মাংসের খেলায় ক্ষমতাশীনেরা হয়তো দুস্থদের দুম্বার মাংস  খেয়েছেন কিংবা খাননি। কিন্তু নিয়ে কোন প্রশ্ন নেই যে, তারা নিজেদের বিবস্ত্র করে ফেলেছেন এবং সকলকে দেখিয়ে দিয়েছেন কেমন দুস্থ তারা হয়েছেন ইদানিং। এখানে ইদানিং শব্দটা হয়তো দৃষ্টিকটু মনে হতে পারে কারন অনেক আগেই রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন  “রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙ্গালের ধন চুরি”। তাই রাজার হস্ত , কাঙ্গালের ধন, ত্রানের টিন, দুম্বার মাংস চুরি করবে এটাই স্বাভাবিক!
কিন্তু প্রশ্ন হলো আমরা কাদের রাজা বলবো, বলছি?
যারা ত্রানের টিন, রিলিফের কম্বল, দুস্থের মাংস, মেরে খান! যাদের রুচি মানসিক সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন করা যায়!
 দুস্থরা তো কাঙ্গাল সম্পদে, কিন্তু এরাতো কাঙ্গাল মানসিকতায়। তাই এক্ষেত্রে রাজার হস্ত কোন কাঙ্গালের ধন চুরি করেনি! বরং কাঙ্গালেরাই চুরি করেছে কাঙ্গালের ধন!
এখন পাঠক, আপনাদেরকে প্রশ্ন, বড় কাঙ্গাল কে? সম্পদের কাঙ্গাল নাকি মানসিকতার কাঙ্গাল?
আপনারা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পারেন এবং সে সব কাঙ্গালদের চিন্হিত করতে পারেন! 
 অনেকে হয়তো বলতে পারেন, নিজের খেয়ে মরুর দুম্বা তাড়ানোর দরকার কি? বা এসব কাঙ্গালদের চিন্হিত করার প্রয়োজনীয়তা কতটুকু?
আমি বলবো, প্রয়োজনীয়তা তাৎপর্যময়। বছরেই বাংলাদেশে আদমশুমারী  হবার কথা রয়েছে। কিন্তু  দূঃখজনক হলেও সত্য, আদম বা মানুষ গননার মতো কাঙ্গাল গননা বা কাঙ্গালশুমারী পৃথিবীর কোন দেশেই নেই। আমরা কাঙ্গাল গননা করে নজির স্থাপন করতে পারি। এবং সেইসব চিন্হিত কাঙ্গালদের নিজের টাকায় মশলা কিনে দিতে পারি! কারন যারা গরিবের হক দুম্বার মাংস চুরি করতে পারে, তারা নিজের টাকায় মসলা কিনে সে মাংস রান্না করবে তা বিশ্বাস যোগ্য নয়, তাই আমরা এসব  কাঙ্গালদের মশলা কিনে দিয়ে লজ্জা দিতে পারি, এবং তারাও লজ্জা পেয়ে নিজেদের সংশোধন করতে পারে। আর এর পরও যদি তারা নিজেদের সংশোধন না করেন তাহলে বলবো, আমাদের দেশে একসময় ঘোষনা দিয়ে ফকির হবার রেয়াজ ছিলো, ঋনের ভারে জর্জরিত হয়ে উপায়ন্তর না দেখলে যে কেউ ঘোষনা দিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি শুরু করতে পারতো এবং করতো। তেমনি ভাবে দুম্বার মাংস ভ্যানিশ করা ম্যাজিশিয়ানেরা যদি নিজেদের সংশোধন করতে নাই পারেন, তাহলে তারা সমাজে নিজেদের কাঙ্গাল হিসাবে ঘোষনা দিতে পারেন এবং সতিৎকারের কাঙ্গাল হয়ে বৈধভাবেই দুম্বার মাংস খেতে পারেন!!!

পুনশ্চঃ গোপন সুত্রে প্রকাশ, দুম্বার মাংসের অপর্যাপ্ততা নিয়ে এসব কাঙ্গালদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। আমি দাতা দেশগুলোর কাছে দাবি জানাচ্ছি, আগামী বছর মাংস নয় যেন আস্ত দুম্বা পাঠানো হয়। যদিও জানি সাড়ে সাত কোটি মানুষের জন্য দশ কোটি কম্বলের মতো, ষোলো কোটি মানুষের জন্য বিশ কোটি দুম্বাও যথেষ্ট নয়!!!-১০মার্চ’১১।